সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

জাতীয় পরিচয়পত্রের দেখভালের প্রশ্ন

জাতীয় পরিচয়পত্রের দেখভালের প্রশ্ন

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২১

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় থাকা ডিজিটাল ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগে হস্তান্তর করার বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিধি ও সেবা অধিশাখা থেকে নির্বাচন কমিশন বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেই চিঠিতে জাতীয় পরিচয়পত্র আইন, ২০১০, যা সংসদ দ্বারা সংবিধানের ধারা ১১৯(২) অনুযায়ী পাসকৃত, তা উদ্ধৃত করে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত, তদারকি ও জারি করার সব দায়িত্ব ‘নির্বাচন কমিশন’-এর পরিবর্তে ‘সরকার’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করাসহ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কাজ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে ‘হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণ করার কথাও বলা হয়েছে।


এই চিঠি পাওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে বলেন, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে আগাম কিছুই জানত না এবং কমিশনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাও হয়নি। তার মানে এটা সরকারের একক সিদ্ধান্ত, যার কোনো যুক্তিসংগত কারণ জানা যায়নি। এই চিঠি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায় থেকে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে।


নির্বাচন কমিশন ২০০৭-০৮ সালে এককভাবে ডিএফআইডির (ইউকে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) উদ্যোগে এবং ইউএনডিপির (ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) সমন্বয়ে দ্য প্রিপারেশন অব দ্য ইলেকটোরাল বোলস প্রজেক্টের (পিইআরপি) আওতায় ভোটার তালিকা ও কার্ড তৈরির তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমোদনে হাতে নিয়েছিল। এই প্রকল্প ইউএনডিপির সমন্বয়ে ডিএফআইডির তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়েছে। আমার জানামতে, সম্পূর্ণ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ খুবই কম ব্যবহার করা হয়েছিল।


প্রথমে একে ‘ভোটার আইডি’ বলা হলেও পরে এর সঙ্গে ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ যুক্ত করা হয়। ছবিসহ ভোটার তালিকা থাকায় শুধু প্রিন্ট এবং প্লাস্টিক কভারের ‘যৎসামান্য খরচে’ যুগপৎভাবে ভোটার তালিকা এবং আইডি প্রস্তুত করার ‘পাইলট’ প্রকল্প’ শুরু করা হয় গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায়। ২০০৭ সালের ১০ জুন ড. শামসুল হুদা কমিশনের তত্ত্বাবধানে এই কাজ শুরু হয় এবং বর্তমান লেখক সেই কমিশনের সদস্য ছিলেন। নির্বাচন কমিশন কাজটি শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতায়।

Gator Website Builder


এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল, তা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। তাদের সহযোগিতা না পাওয়া গেলে বাংলাদেশের ডিজিটালের এই অগ্রযাত্রার ইতিহাস রচিত হতো না। শ্রীপুরের পাইলট প্রকল্পের পর দেশজুড়ে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৭০ হাজার তরুণ-তরুণীকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে স্বল্প সময়ের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়। আর তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে কাজে যুক্ত করা হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার জনবল।


নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী প্রায় ৫০ হাজার সদস্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং এত বড় একটি জনবল নিয়ে মাঠে নামে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অসামান্য ঘটনা। এই কার্যক্রমের সম্পূর্ণ তদারকিতে ছিলেন নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের সব পদের কর্মচারীরা। বছরখানেকের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ভোটারকে ছবিসহ ভোটার তালিকায় নিবন্ধন ও অস্থায়ী পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। বাংলা ভাষায় পৃথিবীর বৃহত্তম তথ্যভান্ডার তৈরি হয় এর মধ্য দিয়ে।


নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ছবিসহ ভোটার তালিকা ও অস্থায়ী আইডি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পের উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে এর আওতায় উপজেলা, জেলা ও জোন ভিত্তিতে সার্ভার স্টেশন তৈরি করা হয়। এসবই পরে প্রকল্পের আওতায় চলে আসে। পরবর্তী সময়ে আলাদাভাবে প্রথমে অর্ডিন্যান্স, পরে ২০১০ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র আইন পার্লামেন্ট দ্বারা অনুমোদিত হয়। বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশে উপজেলা নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ভবনে ভোটার তালিকা এবং তারই অংশ হিসেবে এসব সার্ভার স্টেশনে ভোটার তালিকায় ভোটার অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্মার্ট কার্ডের জন্য বিশ্বব্যাংক এক প্রকল্পে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেয় এবং এরই মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড চালু করা হয়। একই কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে ভোটার তথ্য।


ওপরের তথ্যের আলোকে এ কথা পরিষ্কার, এই প্রকল্প যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন কোনো সরকারি মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে আইডি কার্ডের প্রকল্পে কোনো ধরনের আগ্রহ প্রকাশ করেনি। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পটি প্রায় শতভাগ দাতাদেশগুলোর সহযোগিতায় সম্পন্ন করা হয় এবং ইউএনডিপির হস্তান্তরের পর নির্বাচন কমিশন গত ১৩ বছর যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে এত বড় আয়োজন সম্পন্ন করে আসছে। তৃতীয়ত, ২০১০ সালের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা, জেলা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। চতুর্থত, ২০১০ সালের আইনের এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য নতুন অর্গানোগ্রামের মাধ্যমে আলাদা উইং তৈরি করা হয়, যা পরিচালিত হচ্ছে কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সামরিক বাহিনী থেকে প্রেষণে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে।


ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র কার্যক্রম মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পত্র অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে অর্পণ করা হলে নির্বাচন কমিশনের একটি বৃহৎ অংশ সরকারের উল্লিখিত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত হবে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন সত্তা খর্ব হবে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা নিয়ে দেশ-বিদেশে সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অপর দিকে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও ব্যবহারে জটিলতা সৃষ্টি হবে।


সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কমিশনের। বিদ্যমান আইনের ভাগীদার অন্য কোনো সংস্থাকে করা যাবে না। আইনানুযায়ী নির্বাচনকালে কমিশন আসনভিত্তিক প্রতিযোগী প্রার্থীদের শুধু ওই আসনের তালিকা প্রদান করে মাত্র। সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা দলকেও দেওয়া হয় না। কাজেই অন্য কোনো সংস্থাকে ভোটার তালিকা সরবরাহ সংবিধানসম্মত হবে না।


মন্ত্রণালয়ের আলোচিত চিঠিতে অন্যান্য দেশের কথা রয়েছে। বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক দেশে এনআইডির প্রচলন রয়েছে। বেশির ভাগ উন্নত দেশে বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয় এবং বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বে তৈরি হয়, যেমন নাগরিক কার্ড অথবা পাসপোর্ট কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স। শ খানেক দেশে বিভিন্ন ধরনের কার্ড রয়েছে নাগরিক শনাক্তকরণের জন্য। ভারতে সরকার তৈরি করেছে আধার কার্ড। অন্যদিকে ভোটারদের কমিশন কর্তৃক দেওয়া হয় ‘ভোটার কার্ড’। এসব কার্ড এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি হয় আলাদাভাবে বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, রাজ্য দ্বারা।


যেসব দেশে নাগরিক নিবন্ধনের প্রক্রিয়া আলাদাভাবে হয়, আইডি কার্ডের প্রচলন রয়েছে এবং সেই সে ডেটা ভোটার তালিকা ব্যবহারের বিধি রয়েছে—যেখানে ভোটার তালিকার সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এসব দেশে ভোটার তালিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচনের ফলাফল।

Live Web Chats [en]


বাংলাদেশকে যে অন্যান্য দেশকে অনুকরণ করতেই হবে, এমন কথা নেই। প্রায় ১৩ বছর কমিশন উদ্ভাবিত পদ্ধতি এনআইডি প্রচলিত ও নাগরিকদের তৃণমূল থেকে দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত কোনো বড় সংকট তৈরি হয়নি। ছোটখাটো যা-ও ঘটেছে, তার পেছনেও রয়েছে তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগসাজশ। তবে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে এই প্রকল্প পরিচালনা করতে হলে এর জন্য প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবকাঠামো তৈরি করা, যার সঙ্গে ভোটার তালিকার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আর যত দিন পর্যন্ত আলাদা অবকাঠামো এবং নিজস্ব সার্ভার মেশিন ও জনবল না তৈরি হয়, তত দিন নির্বাচন কমিশন উদ্ভাবিত আইডি কার্ড নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারেই থাকা উচিত। অন্যথায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কথায়, সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হবে।


এ প্রকল্পের শুরু থেকে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পত্র কার্যকর করলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। কাজেই সরকারকে এ বিষয়ে আরও বিশদভাবে ভাবতে এবং অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। যা-ই হোক, কোনোভাবেই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাকে খর্ব করা যাবে না এবং তাদের অবকাঠামো অংশীদারির ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের মতামত প্রণিধানযোগ্য


● ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)


hhintlbd@yahoo.com

Post a Comment

0 Comments