ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধবিরতি, অতঃপর...
এ কে এম শহীদুল হক
২৭ মে, ২০২১
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ
এ বছরের ১০ মে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। রমজানের শুরুতে পূর্ব জেরুজালেমে পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি পুলিশ ঢুকে মাইকের তার ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়ায় এবং ওই এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ফিলিস্তিনি যুবক ও ইসরায়েলি পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। ইসরায়েল তাদের দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা রকম কৌশল ও ফন্দি অবলম্বন করে। গাজার নিয়ন্ত্রণকারী কট্টর ইসলামী দল হামাস ইসরায়েলি কৌশল অনুধাবন করতে পারে। তারা ইসরায়েলের এ ধরনের তৎপরতা বিনা চ্যালেঞ্জে চালিয়ে যেতে দেয়নি। হামাস মনে করে, ইসরায়েলকে একটা মেসেজ দিতে হবে যে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর যে অন্যায় ও জুলুম চালাচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের জেরুজালেম থেকে তাড়ানোর যে ষড়যন্ত্র করছে, তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার সামর্থ্য হামাসের আছে। হামাস ইসরায়েলকে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ এলাকা থেকে ১০ মের মধ্যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার আলটিমেটাম দেয়। ইসরায়েল তাতে কোনো কর্ণপাত না করায় ১০ মে হামাস ইসরায়েলের ভূখণ্ডে রকেট হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপকভাবে বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, তাদের টার্গেট ছিল হামাসের বিভিন্ন আস্তানা, বিশেষ করে হামাসের অবস্থানস্থল, রকেট মারার স্থান, টানেল ইত্যাদি ধ্বংস করা। অথচ ইসরায়েলের বিমান হামলায় অনেক বেসরকারি ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে। ৭২ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০টি শিশু। আহত হয়েছে দুই সহস্রাধিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বসম্প্রদায়ের আহ্বান এবং মিসরের মধ্যস্থতায় ২১ মে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এখন কথা হলো, এই যুদ্ধবিরতি কত দিন বহাল থাকবে?
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় সব যুদ্ধেই আরবরা ইসরায়েলের কাছে পরাজিত হয়েছে। ইসরায়েল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সব সময়ই নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ব্রিটেন-ফ্রান্সও ইসরায়েলকে সহায়তা দিয়েছে।
এদিকে আরব দেশগুলো কখনো ঐক্যবদ্ধভাবে ও আন্তরিকতার সঙ্গে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। মিসর, সিরিয়া, ইরাক ও জর্দান যুদ্ধে অংশ নিলেও ওআইসি, আরব লীগ, ডি-৮-এর মতো মুসলিম দেশের সংস্থাগুলোও কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি। তারা শুধু বিবৃতি, নিন্দা, আহ্বান ইত্যাদি করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। মুসলিম দেশগুলোর মুরব্বি সৌদি আরবকে কখনো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ আছে, সৌদি আরব নেপথ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে। বেশির ভাগ আরব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা কারণে সুসম্পর্ক রাখে। অস্ত্র কিনলেও শর্ত থাকে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র রুষ্ট হলে তাদের গদি থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে অনেক দেশের রাজা-বাদশাহ বা আমিরদের ক্ষমতার গদি নড়বড়ে হয়ে যাবে। এ আশঙ্কায়ও আরবের ক্ষমতাসীনরা কৌশলগত অবস্থান নিয়ে থাকেন।
ইহুদিদের আমেরিকা ও ইউরোপে শক্তিশালী লবি আছে। ইহুদিরা আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। প্রচার আছে যে ইহুদিরা যাকে সমর্থন দেবে সে-ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবে। নির্বাচনের সময় তারা সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীকে বিপুল অঙ্কের অর্থ সহায়তা দেয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মিডিয়ার (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক) মালিক ইহুদিরা। তারা কৌশলে তাদের পক্ষে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরায়েল দিন দিন যেমন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে, তেমনি পশ্চিমা শক্তিধরদের সঙ্গে লবিংয়ের মাধ্যমে সুসম্পর্ক রাখছে, যাতে তাদের সমর্থন ইহুদিদের পক্ষে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এখন অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একমাত্র ইরানই পারে ইসরায়েলের মোকাবেলা করতে। তুরস্কও সামরিকভাবে শক্তিশালী। হয়তো অন্য আরব দেশগুলোর আগ্রহের অভাবে তারাও ঝুঁকি নিতে চায় না, নীরব থাকে।
পক্ষান্তরে জাতিসংঘের কাছ থেকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়, ইসরায়েলের কাছ থেকে দখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন ও নির্যাতন বন্ধের জন্য আরব দেশগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, একতা ও উদ্যোগ নেই। তাদের নিজস্ব সামরিক শক্তির বৃদ্ধিও তেমন হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লবিং নেই বললেই চলে।
হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কত দিন বহাল থাকবে তা বলা যায় না। তবে এই বিরতি যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নয় তা স্পষ্ট। কারণ অতীতে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি হয়েছে। আবার যুদ্ধ বেধেছে। সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া সংঘর্ষ বন্ধ হবে না। স্থায়ী সমাধান হলো দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ইসরায়েলকে অধিকৃত এলাকা ছেড়ে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থানে চলে যেতে হবে। ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি বন্ধ করতে হবে। অসলো চুক্তির শর্ত ইসরায়েলকে মানতে হবে।
১৯৯৩ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) ও ইসরায়েলের মধ্যে অসলো চুক্তি-১ এবং ১৯৯৫ সালে মিসরের তাবায় অসলো চুক্তি-২ স্বাক্ষরিত হয়। অসলো চুক্তির মাধ্যমে পিএলও ইসরায়েল রাষ্ট্র মেনে নেয়। ইসরায়েলিরাও পিএলওকে ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেয়। অসলো চুক্তি মোতাবেক ফিলিস্তিনে প্যালেস্টাইন অথরিটি নামে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যারা পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় স্বায়ত্তশাসন কায়েম করে। গাজা ভূখণ্ড, যেটি দীর্ঘদিন ইসরায়েল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ফেরত দেয়। পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণে নেয় ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার।
অসলো চুক্তিতে ইসরায়েলের অঙ্গীকার ছিল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারির অবসান ঘটানো। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ইসরায়েল সেই প্রতিশ্রুতি কখনো রাখেনি। তারা বরং দখলকৃত এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং সেখানে নতুন করে ইহুদি বসতি গড়ে তোলা অব্যাহত থাকে।
ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের ১৩৪টি সদস্য রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে। অসলো চুক্তির আলোকে জাতিসংঘ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের সদস্য করে নিতে পারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের অধিকৃত জায়গা ফেরত দিতে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে পারত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্ধভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করায় ইসরায়েলের ঔদ্ধত্য দিন দিন বেড়েই চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কোনো রেজল্যুশন পাস হচ্ছে না। জাতিসংঘ ১৯৭৪ সাল থেকে পিএলওকে এবং ২০১২ সাল থেকে ফিলিস্তিনকে কেবল জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাব মোতাবেক ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতিই পারে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধান করতে। এ জন্য প্রয়োজন আরব দেশগুলোর একতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সম্মিলিতভাবে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে সক্রিয় লবিং করে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবির পক্ষে তাদের সমর্থন আদায় করতে পারে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে আরবদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সোচ্চার হতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী লবিং করতে হবে।
একই সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলো সামরিক বাহিনীর সম্প্রসারণ ও শক্তি বৃদ্ধি করে ওআইসি কিংবা আরব লীগের অধীনে যৌথ সামরিক বাহিনী গঠন করার উদ্যোগও নিতে পারে। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা না শুনলে প্রয়োজনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকিও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাখতে হবে।
ফিলিস্তিনে দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া বিকল্প কোনো চিন্তার সুযোগ নেই। আরবদেরও এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মেনে না নিয়ে আরবরা যে ভুল করেছিল তার মাসুল সাত দশকের বেশি সময় ধরে দিচ্ছে। এখন তাদের বাস্তবতা মেনে নিয়েই এগোতে হবে।
ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান হোক, ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে শান্তিতে বাস করুক এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক, এই প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর সহায়তায় বাস্তবায়িত হোক—এ কামনাই করি।
লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ


0 Comments