এবার বাজেট হোক ন্যায়সংগত বরাদ্দের
এম হাফিজউদ্দিন খান
২৬ মে, ২০২১
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ
জুনের শুরুতেই আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এই মুহূর্তে বাজেট তৈরির কাজ চলছে। বাজেট প্রণয়নের জন্য এখন যে কাজটি করতে হবে তা হচ্ছে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করা। দেশে গত বছর বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ বছর বৃষ্টির অভাব দেখা গেছে। কালবৈশাখীতে বেশ কিছু এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শস্যের ক্ষতি হয়েছে। কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পিছিয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় একটা অংশ অর্জন করা যায়নি। দেশে কর্মসংস্থান কমে গেছে, বেকারত্ব বেড়ে গেছে। বহু মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করায় এসব ক্ষয়ক্ষতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলা যাচ্ছে না। দেশে খাদ্যের সংকট না থাকলেও মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিক উত্তরণে আমাদের প্রস্তুতিকাল চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন হবে দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন যে এবারের বাজেটে কৃষি ও দারিদ্র্য বিমোচনে জোর দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রীর এই দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কৃষির উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এ জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই কাজটি যথাযথভাবে করতে হবে। বেশ কয়েক মাস ধরেই দেশের খাদ্যগুদামগুলোতে চালের মজুদ কমে আসছিল। ১৫ লাখ মেট্রিক টন চালের মজুদ থেকে কমতে কমতে এপ্রিল মাস শেষে তিন লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। মজুদ বাড়াতে চাল আমদানির নির্দেশনা থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে আনা যায়নি। এখন কৃষিতে মনোযোগ দেওয়া আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশে যে হারে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে তা চিন্তার বিষয়। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এক গবেষণায় জানিয়েছে, দেশে আড়াই কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে নতুন করে। বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান না হওয়া এর অন্যতম কারণ। এখন এসব মানুষের আয় সংস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই এবারের বাজেট প্রণয়ন খুবই কঠিন একটা কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে। একদিকে রাজস্ব আদায় কম, অন্যদিকে দুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।
kalerkanthoবাজেট প্রণয়নে আমাদের কিছু চিরাচরিত সমস্যাও রয়ে গেছে। আমাদের দেশে ইনক্রিমেন্টাল বাজেট (ক্রমবর্ধমান বাজেট) তৈরি করা হয়। অর্থাৎ কোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য বিদায়ি অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলে নতুন অর্থবছরে রাখা হয় ১১০ কোটি টাকা। এতে প্রয়োজনটা ঠিকমতো খতিয়ে দেখা হয় না। এর বিপরীতে ‘জিরো বেইস বাজেট’ (শূন্য ভিত্তির বাজেট) নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা করা হয় না। কোন খাতে কতটা টাকা দরকার তার সঠিক যাচাই-বাছাই করা হয় না। অথচ শূন্য ভিত্তির বাজেট হলো, কোন খাতে কত টাকার দরকার, তা খাতিয়ে দেখা বা জাস্টিফাই করা। এখন বাজেট দর্শন যা-ই হোক, বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এবারের বাজেটে খরচের বিষয়টি ন্যায়সংগত (জাস্টিফায়েড) হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বাজেট প্রণয়নের আরেকটি সমস্যা হলো যথাযথ পর্যালোচনার অভাব। জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয় প্রতিবছর জুন মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবারে। অর্থাৎ বাজেটের জন্য যে আলাপ-আলোচনা দরকার, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ দরকার, সেটুকু সময় পার্লামেন্টে থাকে না। বাজেট পর্যালোচনা না হওয়ার জন্য আরেকটি ব্যবস্থাও দায়ী এবং সেটি হচ্ছে। আমাদের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ। ফলে যে দল ক্ষমতায় আছে তারা নিশ্চিতভাবেই বাজেট পাস করতে পারে। কারণ এতে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বাজেট যেমনই হোক, তা সংসদে পাস করা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তারপর পার্লামেন্টের যে রুলস অব বিজনেস, তাতে বাজেট নিয়ে পার্লামেন্টের কোনো কমিটিতে আলাপ-আলোচনা করা যায় না। অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কোনো কমিটি বা অন্য কোনো কমিটিতে আলোচনা করা যাবে না। এ ছাড়া আমাদের বিশেষজ্ঞ যাঁরা আছেন, তাঁদের পরামর্শ গ্রহণের সুুযোগও রাখা হয় না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, আমাদের পার্লামেন্টে বিরোধী দল বলতে গেলে নেই। থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগও খুব একটা নেই। আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি কোনো বাজেটের ওপর জাতীয় সংসদে অর্থপূর্ণ আলাপ-আলোচনা বা তর্কবিতর্ক হয়েছে। অবস্থাটা এমন, সংসদে যাঁরা আছেন তাঁরা ভালো করে বাজেট দেখেন না, পড়েন না। এমপিদের বাড়ির কাছে ব্রিজ লাগবে, কালভার্ট লাগবে—অনেকটা এই ধরনের দাবির মধ্যে বাজেট আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে।
১৯৯১ সালের যে পার্লামেন্ট ছিল, তখন বিএনপি সরকারে ছিল এবং আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল। বিরোধী দল হিসেবে তখন আওয়ামী লীগ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্তু তারা পার্লামেন্ট বয়কট করা শুরু করল, যে ঐতিহ্য পরবর্তীকালেও বজায় থাকে। ফলে বাজেটের ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কখনোই বড় রকম অবস্থান দেখা যায়নি। আমাদের ঐতিহ্য হলো, বাজেট যা-ই দেওয়া হোক, সরকারি দল এটিকে স্বাগত জানাবে এবং বিরোধী দল এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে। না দেখে, না পড়েই এই গ্রহণ-বর্জন চলতে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আশা করছি, মাননীয় সংসদ সদস্যরা এবার বাজেট প্রণয়নে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবেন।
আরেকটি বিষয় হলো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে আমরা সব সময় পিছিয়ে আছি। কোনো মন্ত্রণালয়ই তাদের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পাারে না। এবার তা আরো বেড়ে যাবে করোনা পরিস্থিতির কারণে। শুধু এডিপি নয়, সব কিছু আরো পিছিয়ে যাবে। তাই খুব দুঃসময়ের মধ্যে পড়া এবারের বাজেট প্রণয়নে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিভিন্ন খাতে সৃষ্টি হওয়া সংকটগুলো কিভাবে কাটানো যায় সে ব্যবস্থা রাখতে হবে, যদিও সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে। এডিবিও অর্থ দেবে। বাজেট প্রণয়নের আগে এটি ভালো খবর।
আরেকটি দিক হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত যেসব দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তাতে আমাদের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তাদের ঋণ শোধ করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, শোধ-পরিশোধ করার সময় এমবার্গো দিয়েছে, ঋণগ্রহীতাদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাতে চূড়ান্তভাবে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতবার যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা ছিল ব্যাংকনির্ভর। কিন্তু ব্যাংকের টাকা পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু করা হয়নি। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে অনেক ব্যাংক দুরবস্থায় পতিত হবে। এবারের বাজেট প্রণয়নের সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি খেয়াল করা উচিত।
মোটকথা, এবারের বাজেটে করণীয় জানা থাকলেও কিভাবে করণীয় নির্ধারণ করা হয় সেটাই জরুরি। মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ এবারের বাজেট প্রণয়নকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, করোনা মহামারি শিগগিরই কেটে যাবে এমনটা ভেবে বাজেট প্রণয়ন করা ঠিক হবে না। করোনা মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে কিভাবে বাঁচানো যায়, চাঙ্গা করা যায়, সেটাই এবারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাই করোনা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির ব্যবস্থা রাখা, আইসিইউয়ের শয্যা বৃদ্ধিসহ চিকিৎসার সুবিধা বৃদ্ধি, করোনা পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি প্রচার ও কার্যকর করার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়ছিল, তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্যাকেজের অধীনে ধনী মানুষ তথা শিল্পপতিদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, রপ্তানিকারকদের দেওয়া হয়; কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বলতে গেলে অর্থ পাননি। করোনায় তাঁরা আরো গরিব হয়ে গেছেন, অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন। তাই এবারের বাজেটের অধীনে কিভাবে সবাইকে রক্ষা করা যায় এমন একটা ব্যবস্থা রাখতে হবে। সার্বিকভাবে বাজেট গতানুতিকভাবে হলে চলবে না। খাতওয়ারি সংকটগুলো চিহ্নিত করে একটা সমাধানমূলক বাজেট পেশ করতে হবে।
লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
অনুলিখন : আফছার আহমেদ


0 Comments