আমেরিকাকে আবার বৈশ্বিক করুন

লেখা:অ্যান ম্যারি স্লটার ও কাজুমি হোসিনো ম্যাকডোনাল্ড

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২১

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


উদার বৈশ্বিক ব্যবস্থা সেই বিংশ শতাব্দীতেই আটকে আছে। চীন ও রাশিয়ার মতো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যেখানে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো বিস্তৃত করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক কোয়াড (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত) জোটের মতো আঞ্চলিক জোট তৈরিকরণে ব্যস্ত। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা, যে দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে থাকবে মূল্যবোধ ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। 

গণতন্ত্রের চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদের নতুন এই ধরন ক্রিমিয়া থেকে তাইওয়ান পর্যন্ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ‘গ্রে-জোন’-এর যুদ্ধনীতি পূর্ব ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক অখণ্ডতা, মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক নির্বাচন, প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা ও আইনের শাসনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এসব ছোটলোকি হুমকি এখন আর শুধু ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা রাশিয়ার সমস্যা নয়। তারা সব ধরনের উদার সমাজ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকেই টার্গেট করেছে। এটা অতিশয় দুর্ভাগ্য যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করেছে, তা কোনো উদার সমাজের সহজাত বিষয়গুলোর জন্য উপযুক্ত নয়। জি-৭, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কোয়াড আঞ্চলিকভাবে খুব তৎপরতা চালাচ্ছে, যেন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বেশ জোরালোভাবে সাড়া জাগাতে পারে।

কর্তৃত্ববাদকে মোকাবিলার জন্য আমেরিকার কৌশল হওয়া উচিত বিশ্বভিত্তিক, আঞ্চলিকতাভিত্তিক নয়। এককতার পরিবর্তে বহুত্ববাদী কৌশল গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে কৌশল হওয়া উচিত ইস্যুভিত্তিক, দেশভিত্তিক নয়

অর্ধপরিবাহীগুলোর কথাই ধরুন। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের এশীয় সহযোগীরা যেসব জৈব প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তি তৈরি করেছে, সেসব প্রযুক্তি একচেটিয়াভাবে বাজার দখল করেছে। অন্যদিকে অর্ধপরিবাহী নির্মাতারা এখনো বিশ্ববাণিজ্য ও বুদ্ধিকৌশলের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে চীন খুব গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বর্তমানে এমন কোনো গণতান্ত্রিক ফোরাম নেই, যার ছায়াতলে সবাই আন্তর্জাতিক মান, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের এশীয় সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে প্রযুক্তিসহনশীল অর্থনীতি। তাদের রয়েছে উন্নত জীবনযাপন। তারা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় অর্ধেকটা নিয়ে নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সহযোগিতার লক্ষ্য রয়েছে কিংবা আগেও ছিল। ২০১৯ সালের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন এবং লেখক ও পণ্ডিত রবার্ট কাগান ‘গণতন্ত্রের লিগ’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একইভাবে বাইডেন তাঁর ক্ষমতারোহণের পয়লা বছরেই ‘গণতন্ত্রের শীর্ষ সম্মেলন’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এই উদার গণতান্ত্রিক ক্লাবে কারা থাকবে, এ ছিল বাইডেন প্রশাসনের সামনে এক বিরাট প্রশ্ন। শেষে সম্মেলনের নাম একটু পরিবর্তন করে গণতন্ত্রের শীর্ষ সম্মেলন আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।


Gator Website Builder

শুধু গণতন্ত্রের দিকে মনোনিবেশ না করে উন্মুক্ত সমাজ, আইনের শাসন, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার, অর্থনৈতিক সুবিধা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, বাক্স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সমতা—এসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া উচিত। এসব লক্ষ্য সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বিভিন্ন কর্মপন্থা তৈরি করা এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ড তৈরির স্বার্থে ছোট দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করা।


মুক্ত সমাজ বিকশিত করার সবচেয়ে ভালো চর্চার সময় হতে পারে এই মহামারি। উদাহরণ হিসেবে তাইওয়ানের কথা বলা যায়। চলমান এই কোভিড-১৯ মহামারিকালে তারা সবচেয়ে সফলতা দেখিয়েছে। যদিও তাদের টিকার অভাব ছিল এবং চীন ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি একটি দেশ তারা। বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান সম্প্রতি তাইওয়ানের মহামারি মোকাবিলার প্রশংসা করে বলেছেন, তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। মহামারি মোকাবিলার নীতিমালা বা আচরণবিধি নির্ধারণের জন্য নিউজিল্যান্ডের দিকেও তাকাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি কীভাবে মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছে, তা দেখে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। অথবা জলবায়ু পরিবর্তনসম্পর্কিত কিয়োটো প্রটোকলের মতো একটি ফোরামও হতে পারে।


এ ধরনের ফোরামগুলোকে সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে সীমায়িত করা উচিত নয়। গণতন্ত্রকে গতিশীল করতে সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলো বহুমুখী শক্তি নিয়ে তৎপর। কোভিড-১৯ মহামারির এই সে সময়ে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান এবং ফাইজার-বায়োএনটেকের মতো ভ্যাকসিন উদ্ভাবনকারীরা সমাজের জন্য অমূল্য হয়ে উঠেছে।


২০০৭ সালের দিকে ক্রমে সাইবার আক্রমণের পরে এস্তোনিয়া বহুমুখী ডিজিটাল পদ্ধতির বিকাশ ঘটিয়েছে। এতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়েছে। এস্তোনিয়ার ‘ডিজিটাল নোম্যাড’ ভিসা কানাডা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকদের এস্তোনিয়ায় কাজ করার অনুমতি দিয়েছে, যার ফলে বেসরকারি খাতের দক্ষতা বেড়েছে।


এদিকে বাইডেন প্রশাসন আসন্ন জি-৭ এবং ন্যাটো সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভবত এক টেবিলে বসবে না। যাহোক, মানবাধিকার, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি পরিচালনা ও সরবরাহ এবং বিশ্বব্যাপী করপোরেট ট্যাক্স ইত্যাদি ব্যাপারে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিতে পারে।


কর্তৃত্ববাদকে মোকাবিলার জন্য আমেরিকার কৌশল হওয়া উচিত বিশ্বভিত্তিক, আঞ্চলিকতাভিত্তিক নয়। এককতার পরিবর্তে বহুত্ববাদী কৌশল গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে কৌশল হওয়া উচিত ইস্যুভিত্তিক, দেশভিত্তিক নয়।


ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট


● অ্যান ম্যারি স্লটার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার প্রধান নির্বাহী ও প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং কাজুমি হোশিনো-ম্যাকডোনাল্ড ওয়েটেক্স অ্যাডভাইজারসের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট